বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টিভিস্ট ম্যানুয়াল : নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকরী ক্যাম্পেইন সংক্রান্ত নির্দেশিকা

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছেন কিংবা করবেন, এই ম্যানুয়ালটি তাদের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কাজে বিভিন্ন দিক আছে। যেমন: নেতৃত্ব তৈরি, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকরী ক্যাম্পেইন পরিচালনা ইত্যাদি। এ কাজগুলো কিভাবে ধাপে ধাপে করতে হবে তার নির্দেশনা এই ম্যানুয়ালে পাবেন।

. কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করবেন?

বিশ্ববিদ্যালয় হলো তরুণ ছাত্রদের মিলনমেলা। আমাদের দেশের বড় বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং ছাত্ররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ‘২৪ এর অভ্যুত্থান, বরাবরই ছাত্ররা ছিল দেশ পরিবর্তনের আন্দোলনের প্রথম সারিতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব

  • সাংস্কৃতিক প্রভাব: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেক্যুলার শক্তির আদর্শিক এবং সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান কালচার এবং কারিকুলামকে ব্যবহার করে একসাথে এমন অনেকগুলো মানুষের মগজধোলাই করা সম্ভব, যারা কিনা ভবিষ্যৎ সমাজের নেতৃত্ব দেবে। তাই সমাজ পরিবর্তন করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেক্যুলারিজম এবং দ্বীন ইসলামের মধ্যেকার আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করা জরুরী। আর তার জন্য প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শক্ত উপস্থিতি।  
  • নেতৃত্ব গঠন: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই আগামীর নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তৈরি হয়।  
  • তৈরি জনশক্তি: শ্রেণি হিসেবে ছাত্ররা তুলনামূলকভাবে বেশি সংগঠিত, উদ্যমী এবং আদর্শবান। ছাত্ররা সহজেই নিজেদেরকে সংগঠিত করতে পারে। তাদের মধ্যে গ্রুপ মেন্টালিটি বা ‘ছাত্র পরিচয়’ কাজ করে। একজন ছাত্র হিসেবে আরেকজন ছাত্রের বিপদে এগিয়ে আসা, ইতিবাচক পরিবর্তনে পদক্ষেপ নেয়া, নেতিবাচক বিষয়ে বিরোধিতা করা – এসব ক্ষেত্রে তারাই অগ্রগামী শক্তি। কাজেই ছাত্রদের জন্য অর্থবহ বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়।

. বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক অ্যাক্টিভিজমের লক্ষ্য

ক্যাম্পাসে কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অ্যাক্টিভিস্টদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। না হলে কাজে উদ্যম এবং অনুপ্রেরণা পাওয়া যাবেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাক্টিভিজমের প্রধান লক্ষ্যসমূহ:

  • ইসলামের সাংস্কৃতিক প্রভাব বৃদ্ধি: ক্যাম্পাসে বিদ্যমান পশ্চিমা এবং হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির বিপরীতে ইসলামী বিশ্বাস এবং মূল্যবোধকে ভিত্তি করে একটি  প্রতিসংস্কৃতি (Counter culture) গড়ে তোলা।
  • নেতৃত্ব বিকাশ: বাছাই করা ছাত্রদেরকে নেতৃত্বের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
  • ছাত্রসমাজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব: শিক্ষার্থীদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধান করা, যাতে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে তাদের আস্থা ও সমর্থন অর্জন করা যায়।
  • ধারাবাহিকতা ধরে রাখা: ক্যাম্পাসের ক্লাস/ডিপার্টমেন্টের প্রতিটা ব্যাচে নেতৃত্বের একটি পাইপলাইন তৈরি করা যাতে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

. বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক অ্যাক্টিভিজমের স্বাতন্ত্র্য:

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক অ্যাক্টিভিজম কমিউনিটি অথবা এলাকাভিত্তিক অ্যাক্টিভিসজমের চেয়ে বেশ কিছু কারণে আলাদা। যেমন:

  • সময়সীমা: বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা অল্প কয়েক বছরের জন্য অবস্থান করে। তাই নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত মানুষ তৈরির কাজটা তুলনামূলক দ্রুত করতে হয়।
  • ক্যাম্পেইনের ফোকাস: ক্যাম্পাসে কাজের লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রভাব বিস্তার। আর লক্ষ্য পূরণের মাধ্যম হিসেবে থাকে তরুণদের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান, এবং ছাত্রসমাজের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন। এগুলোকে মাথায় রেখেই মূলত কাজ করতে হয়; পলিসি তৈরি করতে হয়, উদ্যোগ নিতে হয়।
  • ভলান্টিয়ার সহলভ্যতা: ক্যাম্পাসে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজের মানুষ পাওয়া তুলনামূলক সহজ। তবে এর জন্য জন্য দৃশ্যমান এবং আপাতভাবে উপকারী কিছু কর্মকান্ড থাকা জরুরী।

. টার্গেট অডিয়েন্স

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে আপনাদের কাজের ক্ষেত্র হবে পুরো ছাত্র সমাজ, শুধু প্র্যাক্টিসিং মুসলিমরা না। অ্যাক্টিভিজমে সফলতার জন্য আপনাদেরকে নিয়মিত বৃহত্তর ছাত্রসমাজের স্বার্থ নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে, যে আপনি সব ছাত্রদের কল্যাণে কাজ করছেন। পাশাপাশি নিজেদের বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে তাদেরকে যুক্ত করার লক্ষ্য রাখতে হবে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

  • গ্রহণযোগ্যতা: ছাত্ররা আপনাদেরকে তাদের একজন হিসেবে দেখতে হবে। তাদের চোখে আপনারা হবেন ছাত্রসমাজের নানা সমস্যার সমাধান এবং স্বার্থরক্ষার প্রতিনিধি। এই ক্ষেত্রে তারা আপনাদের মানহাজ বা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত হওয়াটা জরুরী না।
  • আস্থা: বৃহত্তর পরিসরে কাজ করলে এবং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হলে অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা এবং শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়।
  • অন্তর্ভুক্তি: অ্যাক্টিভিস্ট ইউনিটের সদস্য এবং ভলান্টিয়ার আনতে হবে সাধারণ ছাত্র সমাজ থেকে। এজন্য সাধারন ছাত্রদের টার্গেট অডিয়েন্স হিসেবে রাখা জরুরী। একইসাথে যারা কাজে যুক্ত হবে তাদের প্র্যাকটিসিং মুসলিমে পরিণত করাও জরুরী।

সামষ্টিক সমস্যা নিয়ে কাজ করা:

নিয়মিত এমন কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করা উচিৎ যেগুলো ছাত্রসমাজ সামষ্টিকভাবে তাদের সমস্যা মনে করে। যেমন:

  • ক্যান্টিনে খাবারের কোয়ালিটি এবং দাম
  • র‍্যাগিং ও বুলিং এর বিরুদ্ধে সচেতনতা ও পদক্ষেপ
  • মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং

বিঃদ্রঃ এগুলো কিছু উদাহরণ মাত্র। কর্মসূচি সফল করতে হলে আপনাদের নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে হবে। সকল ক্যাম্পাসের সমস্যার ধরণ এক রকম হবে না।

. সফল অ্যাক্টিভিস্ট ইউনিট গড়ার প্রক্রিয়া

এককভাবে শুরু করা

আপনি যদি একা শুরু করেন, তাহলে নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুনঃ

  • ছোট কিন্তু ইম্প্যাক্টফুল অথবা দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিন। যেমন-লিফলেট বিতরণ, বই বিতরণ বা পরিবেশ সংক্রান্ত কোনো ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে পারেন।
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গ্রুপ চ্যাট ব্যবহার করে কাজের আপডেট শেয়ার করুন এবং আপনাদের বাছাই করা ইস্যু নিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিন।
  • সহপাঠীদেরকে কাজে ভেড়াতে থাকুন। একা শুরু করে দুয়েকটা ইভেন্টের পর আপনাদের আশপাশের বন্ধু-বান্ধবও আস্তে আস্তে আগ্রহ দেখাবে। তাদেরকে সাথে নিন। শুরুতে তাদেরকে কিছু ছোটখাটো, সহজ কাজ দিন। তাদের কাছে সাহায্য চান। উৎসাহ দিন। তারপর ধীরে ধীরে কাজে নিয়ে আসুন।

পরামর্শ: একটি দল গঠন করে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নিলে সবার উপর চাপ কমে আসে।

এক থেকে একশ

  • একটি ছোট দল গঠন করার পর নিচের কাজগুলো নিয়মিতভাবে করতে থাকুনঃ
  • সাপ্তাহিক হালাকাহ (পাঠচক্র) আয়োজন করুন: নিজেদের পড়াশোনা, দৃষ্টিভঙ্গি,  জানাশোনাগুলো শেয়ার করার জন্য পাঠচক্র জরুরী। এতে নিজেদের ভেতর পারষ্পরিক বোঝাপড়া এবং কাজের প্রতি কমিটমেন্টও জোরদার হয়। কাজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে একই জায়গায় আসা সহজ হয়।
  • ছোট ছোট উদ্যোগ নিন:
    • পোস্টারিং
    • ক্যাম্পেইনিং বা প্রচারণা
    • সচেতনতা কর্মসূচি (Awareness campaign)
    • ইন্টারেক্টিভ আলোচনা, মত বিনিময় ইত্যাদি
  • প্রথমেই বড় ইভেন্ট বা কাজে হাত দেয়া উচিৎ না
  • সামগ্রিক ছাত্রসমাজের কোন একটি সমস্যা চিহ্নিত করে সেটি সমাধানের জন্য কাজ করুন, যেমন:
  • ক্যান্টিনের মানোন্নয়ন
  • মানসিক স্বাস্থ্য এবং র‍্যাগিং বিরোধী উদ্যোগ
  • উল্লেখ্য, এটি নানাভাবে শুরু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে স্রেফ জরিপ বা গণস্বাক্ষর অভিযানের মাধ্যমেও ভলান্টিয়ার সংগ্রহ এবং জনসংযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।

ফলাফল: এসব দৃশ্যমান এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে আপনি শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি এবং সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হবেন। ফলে আপনাদের ইউনিটও আস্তে আস্তে বড় হতে থাকবে।

. কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা

  • আপনাদের ইউনিট সংগঠিত এবং কাজকে অর্থবহ ও টেকসই রাখতে নিচের কাজগুলো জরুরী:
    নিয়মিত কার্যক্রম: কাজের প্রভাব ধরে রাখতে, ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান ও প্রাসঙ্গিক থাকতে নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে ছোট ছোট কর্মসূচির আয়োজন করুন।
  • নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলুন: ফার্স্ট ও সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রদের বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়ে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করুন যাতে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয় এবং কাজ থেমে না থাকে।
  • নেটওয়ার্ক তৈরি করুন: আপনাদের কাজের প্রতি সমর্থন পেতে শিক্ষক, কর্মচারী এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন। এমনটাও দেখা যাবে যে আপনি হয়ত তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছেন।
  • স্বচ্ছতা বজায় রাখুন: অর্থনৈতিক লেনদেনসহ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রায় স্বচ্ছতা বজায় রাখুন। খরচ ও লেনদেনের ডকুমেন্টস সংরক্ষিত রাখুন। এতে করে আপনাদের ইউনিটের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি হবে।

. বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান

১। দুটি চ্যালেঞ্জ:

অ্যাক্টিভিজমের ক্ষেত্রে দুটি কমন চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়:

  • পরিষ্কার লক্ষ্য না থাকা: বড় আকারের ইভেন্ট দিয়ে অ্যাক্টিভিজম শুরু না করে ছোট ছোট উদ্যোগ নিন। আপনাদের লক্ষ্য সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করা, গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করা, এবং প্রভাব বাড়ানো। তাই শুরুতেই অনেক বড় কোন আয়োজন দিয়ে শুরু করার প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন। সতর্কতার সাথে ইস্যু এবং কর্মসূচি বাছাই করুন। নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যান। এভাবে ধীরে ধীরে ছাত্রসমাজের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এবং নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করে নিন।
  • বাস্তবতা বিবর্জিত পরিকল্পনা: আপনাদের সামর্থ্য কতটুকু, আগে সেটা ভালো করে বুঝুন। কোন কোন জায়গায় নিজের সীমাবদ্ধতা আছে খুঁজে বের করুন। তারপর নিজেদের এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করুন:
    • ছাত্ররা কি আপনাদের দাবিকে সমর্থন করবে? দাবি আদায়ে তাদেরকে কি সাথে পাবেন?
    • নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ও সামর্থ্য কি আপনাদের ইউনিটের আছে?
    • নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব কি ইউনিটের সদস্যদের মধ্যে কার্যকরভাবে বণ্টন করা যাবে?

. অন্য কেউ আপনাদের কাজের কৃতিত্ব নিয়ে নিচ্ছে:

এটিও একটি কমন সমস্যা। বিশেষ করে ছোট ইউনিটগুলোর জন্য। এই সমস্যার একক কোনো সমাধান নেই। কারণ আপনাদের নেয়া উদ্যোগগুলো কখনও কখনও ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি অথবা দলের নেয়া উদ্যোগের সাথে মিলে যেতে পারে। তবে এই সমস্যাটা কমানোর (Minimize) জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থাগুলো নেয়া যায়:

  • যথাযথ এবং ব্যাপক প্রচারণা চালানো: প্রতিটি কাজের প্রচারণায় স্পষ্টভাবে আপনাদের ইউনিটের ব্র্যান্ডিং করুন, যাতে আপনাদের ইউনিটের পরিচিতি ভালোভাবে বুঝা যায়।
  • আপনাদের কাজগুলোকে ডকুমেন্টেড (নথিভুক্ত) রাখুনঃ
  • নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া পেইজ/চ্যানেল ইত্যাদি চালু করুন।
  • কাজের ঘোষণা, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়াতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে, ওয়াটস্যাপে শেয়ার করুন।
  • ছবি, ভিডিও, ব্যানার এবং অন্যান্য কন্টেন্টে নিজেদের লোগো/ওয়াটারমার্ক ব্যবহার করুন।
  • মোট কথা আপনাদের ইউনিটের কাজ এবং নাম দুটোই দৃশ্যমান রাখুন। লাজুক হলে চলবে না।
  • আপনাদের কাজগুলো হাইলাইট করুন: বিভিন্ন বক্তব্য, পোস্ট এবং সাক্ষাৎকারে আপনাদের ইউনিটের নাম বারবার উল্লেখ করুন।
  • ফিডব্যাক সংগ্রহ করুন: গ্রহণযোগ্যতা তৈরি এবং কাজের প্রচারের জন্য সাধারণ ছাত্রছাত্রী, ফ্যাকাল্টি, ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণকারী ভলান্টিয়ারদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিন, এবং সংরক্ষণ করুন। নিয়মিত নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শেয়ার করুন। উদাহরণ:

আমরা অমুক (ইউনিটের নাম)। আমরা অমুক মাস তমুক কাজটি করেছিলাম, এই কাজটির ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি। আপনি কাজটির ব্যাপারে কি কিছু জানেন? জানেন না? তাহলে দেড় মিনিটে অল্প করে একটু বলি…(বলা শেষ হলে) আপনি কি মনে করেন আমাদের (ইউনিটের নাম) এই উদ্যোগের মতো আরও উদ্যোগ নেয়া দরকার? আপনার কোন সাজেশন? এভাবে না করে, অন্য কোনভাবে কি কাজগুলো করা যেতে পারে? এ ব্যাপারে আপনার মতামত? সব শেষে আমাদের (ইউনিটের নাম) প্রতি কোন পরামর্শ?

  • ক্রমাগত বৃদ্ধি: ছোট, দৃশ্যমান কাজ দিয়ে শুরু করুন, যাতে অন্যরা সহজে কৃতিত্ব নিতে না পারে। ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসে আপনাদের প্রভাব বাড়ান।

যদি অন্য ইসলামী গ্রুপগুলো বিরোধিতা করে।

  • ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখুন: ইসলামী ভ্রাতৃত্ব এবং আল ওয়ালা’ ওয়াল বারা এর মূলনীতি মেনে চলুন।মনে রাখবেন, তারা আপনাদের ভাই, এবং আপনাদেরকে আল-ওয়ালা’ (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালবাসা) ধরে রাখতে হবে। এটা আকিদার অংশ।
  • আপনাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করুন: বলুন যে আপনাদের কর্মকাণ্ড সকলের জন্য উপকারী। আপনারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং দ্বীন ইসলামের কাছে সহযোগী। ইসলামের শিক্ষার জায়গা থেকে একে অপরের কাজে বিরোধিতা করা কাম্য না।
  • যেখানে সম্ভব সেখানে সহযোগিতা করুন: যেসব ক্ষেত্রে অন্য দলগুলোর সাথে সমন্বয় এবং সহযোগিতা করা জায়েজ, এবং কওমের বৃহত্তর স্বার্থ জড়িত সেখানে সমন্বয়-সহযোগিতা করুন। যেমন, ইসলামবিদ্বেষ সংক্রান্ত কোন ইস্যু বা জাতীয় কোন ইস্যুতে। তবে মনে রাখবেন, যদি আপনি বড় দলের সাথে মিলে ক্রমাগত কাজ করতে থাকেন তাহলে আপনার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রক্ষা করা এক সময় কঠিন হয়ে যাবে। তাই এধরণের সমন্বয়-সহযোগিতা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা উত্তম।
  • শান্তিপূর্ণভাবে শক্তি বৃদ্ধি করুন: বিরোধিতা বেড়ে গেলে সংঘর্ষ এড়িয়ে যথেষ্ট শক্তি এবং কাজের গতি তৈরিতে মনোযোগ দিন।
  • সাধারণ ছাত্র সমাজের সমর্থন: এসব ক্ষেত্রে সাধারণ ছাত্র সমাজের সমর্থন আপনাদের কাজে লাগবেন। তাই নিয়মিত সাধারণ ছাত্রদের ইস্যু নিয়ে সোচ্চার এবং সক্রিয় থাকুন। কোন অযাচিত বাধার সম্মুখীন হলে সাধারণ ছাত্রসমাজ আপনাদের পক্ষে কথা বলবে।

. করণীয়-বর্জনীয়

করণীয়:

✅ সামগ্রিক ছাত্রসমাজকে টার্গেট অডিয়েন্স হিসেবে গ্রহণ। ছাত্রসমাজের সমস্যার সমাধান এবং স্বার্থ রক্ষার ইস্যু নিয়ে নিয়মিত সোচ্চার ও সক্রিয় থাকুন।

✅ ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন। ধীরে ধীরে কাজের আকার ও পরিসর বৃদ্ধি করুন। সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ান।

বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে, কর্মীদের মনোবল অটুট রাখতে ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করুন এবং

✅ সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা এবং সমর্থন পাওয়ার জন্য বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে সেটার সমাধানে কাজ করুন।

✅ শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, এবং ছাত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন।

✅ নিজেদের কার্যক্রমের প্রচারণার জন্য স্পষ্ট, ধারাবাহিক ব্র্যান্ডিং করুন এবং ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণ করুন।

বর্জনীয়:

❌ নিজেদের সামর্থ্য যাচাইবাছাই না করে শুরুতেই বড় কোন কাজ হাতে নেয়া।

❌ শুধু প্র্যাকটিসিং ছাত্রছাত্রী বা দ্বীনি কমিউনিটিকে মাথায় রেখে কর্মসূচি ও কাজ ঠিক করা।

❌ সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যাগুলো উপেক্ষা করা।

❌ কার্যক্রম প্রচার না করা, ডকুমেন্টেড না রাখা এবং এইভাবে অন্যদের ক্রেডিট চুরির সুযোগ করে দেয়া।

❌ কার্যক্রম এবং লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে ব্যর্থতা।

উপসংহার

বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাক্টিভিজমের ক্ষেত্রে কৌশলী হওয়া এবং ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। বৃহত্তর ছাত্রসমাজের সমস্যাগুলো সমাধান করা, ছাত্রদের নেতৃত্বের বিকাশ এবং ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারের মাধ্যমে অ্যাক্টিভিস্টরা একটি দৃশ্যমান এবং প্রভাবশালী আন্দোলন তৈরি করতে পারে। কাজ আপনি এককভাবে করুন অথবা একটি ইউনিট তৈরি করে দলবদ্ধভাবে করুন- আস্থা অর্জন, তাদের মাঝে প্রভাব বিস্তার এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে কাজ করার ক্ষেত্রে এই ম্যানুয়ালটি  আপনাদের জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।

মনে রাখবেন: ছোট ছোট কাজ, সহজে অর্জন করা যায় এমন লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেন। ধাপে ধাপে কাজের পরিধি বাড়ান। তাকওয়া, তাওয়াককুল, ইখলাস, আত্মবিশ্বাস, বিনয়, এবং সঠিক নিয়্যাতের সাথে কাজে এগিয়ে যান।