অ্যাক্টিভিজম কী এবং অ্যাক্টিভিজম কী না

ভূমিকা:

অ্যাক্টিভিজম কী? অ্যাক্টিভিজম হলো সমাজ পরিবর্তনের জন্য এবং সমাজের নানা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সংগঠিত প্রচেষ্টা। কেবল তাৎক্ষনিক প্রয়োজন মেটানো বা সমস্যার সমাধান অ্যাক্টিভিজমের উদ্দেশ্য না। বরং অ্যাক্টিভিজমের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান সিস্টেমের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং বিদ্যমান কাঠামোকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা অর্জন। মূলত, অ্যাক্টিভিজম হলো সামাজিক শক্তি অর্জনের পথ। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দাবি আদায়, হক্ব রক্ষা করা এবং সমাজের নানা ফলাফলকে প্রভাবিত করার জন্যেই অ্যাক্টিভিজম। 

আমরা কেন অ্যাক্টিভিজম করি?

আমরা অ্যাক্টিভিজম করি –

  • সামাজিক শক্তি অর্জনের জন্য, যাতে করে দাবি আদায় করা যায়, সমস্যার সমাধান করা যায়, কওমের হক্ব রক্ষা করা যায়।
  • মাজলুমকে সাহায্যের জন্য।
  • সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধের লক্ষ্যে।
  • রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোগত জুলুম এবং না-ইনসাফীকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য।
  • সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা ও ইস্যু নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ইসলামের দাওয়াহ সমাজের মানুষের কাছে কার্যকরীভাবে পৌছে দেয়ার জন্যে।
  • কেবল উপসর্গ না, বরং বিভিন্ন সমস্যার পেছনের মূল কারণগুলো সমাধানের লক্ষ্যে।
  • ইসলামী শিক্ষার আলোকে সমাজ পরিবর্তনের জন্যে। 

মনে রাখবেন: অ্যাক্টিভিজম হলো সেই হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ অসাধারণ পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়ে ওঠে। 

অ্যাক্টিভিজমের উদ্দেশ্য

অ্যাক্টিভিজম সামাজিক শক্তি অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। অ্যাক্টিভিজমের উদ্দেশ্য সামাজিক শক্তি অর্জন। সামাজিক শক্তি হলো:   

  • সমাজের ফলাফল ও সিদ্ধান্তগুলো প্রভাবিত করার ক্ষমতা। 
  • নিজ আদর্শকে (পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ইসলাম) সমাজে প্রভাবশালী করে তোলা।
  • অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সমস্যার সমাধান করা। 
  • রাষ্ট্রযন্ত্র, কিংবা অন্য গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগ কিংবা দাবি আদায়ের সক্ষমতা অর্জন করা।
  • নিজ কওমের হক্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করার সক্ষমতা গড়ে তোলা।

অ্যাক্টিভিজম নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

ত্রাণ দেয়া (যেমন শীতবস্ত্র বিলি বা বন্যার্তদের সাহায্য করা) কি সামাজিক শক্তি তৈরি করতে পারে?

→ না। তবে এটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সক্ষমতা তৈরিতে সহায়ক হলে ভিন্ন কথা।

কোনো বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা কী অ্যাক্টিভিজম?

→  হ্যাঁ, যদি তা এমন সচেতনতা হয় যা মানুষকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করে।

জুলুমী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা কি অ্যাক্টিভিজম?

→  হ্যাঁ, বিশেষত এটি যখন সম্মিলিত, সংগঠিত এবং টেকসই প্রচেষ্টার মাধ্যমে হয়, তখন।

অ্যাক্টিভিজমের নানা সুরত

অ্যাক্টিভিজমের বিভিন্ন ধরণ রয়েছে, তবে সামাজিক শক্তি তৈরির ক্ষেত্রে সবগুলো একই রকম কার্যকরী না:

  • ডাইরেক্ট সার্ভিস বা সরাসরি সেবা দেয়া:
    • উদাহরণ: খাদ্য, পোশাক বা আশ্রয় প্রদান।
    • শক্তি: তাৎক্ষণিক সহায়তা দেয়া যায়, ইতিবাচক জনমত তৈরি করে।
    • দুর্বলতা: কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা এবং এগুলোর কারণগুলো চ্যালেঞ্জ করে না।
  • সেলফ হেল্প:
  • উদাহরণ: কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে কমিউনিটি করে নিজেরাই পুনর্গঠনের কাজ হাতে নেয়া।
  • শক্তি: কমিউনিটির ঐক্য ও আত্মনির্ভরতা বাড়ায়।
  • দুর্বলতা: সমস্যার মূল কারণগুলোর সমাধান সাধারণত এভাবে হয় না।
  • শিক্ষামূলক (সচেতনতা বৃদ্ধি):
    • উদাহরণ: প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগত জুলুম নিয়ে ওয়ার্কশপ, লিফলেট, স্ট্রিট দাওয়াহ।
    • শক্তি: সচেতনতা বৃদ্ধি করে, ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করে।
    • দুর্বলতা: তাৎক্ষণিক বা সরাসরি ফলাফল আনতে পারে না।
  • অ্যাডভোকেসি (সুপারিশমূলক):
    • উদাহরণ: কোন নীতিমালা বা পলিসি পরিবর্তনের জন্য সরকার বা প্রতিষ্ঠানের কাছে লবিং।
    • শক্তি: কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের দিকে মনোযোগ দেয়।
    • দুর্বলতা: এই পদ্ধতি ছোট একটি গোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করতে পারে না।
  • ডাইরেক্ট অ্যাকশন
    • উদাহরণ: বিক্ষোভ, ধর্মঘট, অবস্থান কর্মসূচি, ঘেরাও।
    • শক্তি: সম্মিলিত শক্তি তৈরি করে, দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে, এবং প্রায়ই বাস্তব ফলাফল আনে।
    • দুর্বলতা: ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও সংগঠন প্রয়োজন।

কার্যকর অ্যাক্টিভিজম: ডাইরেক্ট অ্যাকশন-এর গুরুত্ব

অ্যাক্টিভিজমের সব সুরতেরই কার্যকারিতা আছে। তবে সামাজিক শক্তি তৈরিতে সবচেয়ে কার্যকর হলো ডাইরেক্ট অ্যাকশন, কারণ:

  • এটি একটি সাধারণ ইস্যু, লক্ষ্য বা আদর্শকে কেন্দ্র করে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে।
  • নীতিনির্ধারকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
  • এটি কওমের সম্মিলিত শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে কওমে ক্ষমতায়িত করে।

প্রশ্ন: কীভাবে আপনাদের অ্যাক্টিভিজমে ডাইরেক্ট অ্যাকশনকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে? কীভাবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিশ্চিত করবেন?

উপকারী কাজ বনাম অ্যাক্টিভিজম

সব উপকারী কাজই যুতসই অ্যাক্টিভিজম নয়। উদাহরণস্বরূপ:

  • ত্রাণ কাজ উপকারী, কিন্তু এটি যদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে না পারে তাহলে এটি আমাদের জন্য উপযুক্ত অ্যাক্টিভিজম নয়
  • দ্বীনি শিক্ষা (যেমন, স্টাডি সার্কেল বা খুতবা আয়োজন) অ্যাক্টিভিজমকে সহায়তা করে, তবে অ্যাক্টিভিজম নয়।

উল্লেখ্য, নিঃসন্দেহে এই কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এগুলোর গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না, বা এগুলোতে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে না। এখানে শুধু অ্যাক্টিভিজমের সাথে এধরণের কাজের পার্থক্য দেখানো হচ্ছে।

ভেবে দেখুন: আপনাদের কাজগুলো কি সত্যিই সামাজিক শক্তি তৈরি করছে, নাকি কেবল সাময়িক সমাধান দিচ্ছে?

অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য গাইডলাইন

টার্গেট অডিয়েন্স:

  • স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির বা পেশাদার সাধারণ মুসলিমদের উদ্বুদ্ধ করায় এবং তাদের সমর্থন অর্জনে ফোকাস করুন। এরা হলো সেই সব মানুষ যারা ইসলামী শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে না, আবার পুরোপুরি প্র্যাক্টিসিং মুসলিমও না, এবং তারা অন্য কোন দ্বীনি কর্মকান্ডের সাথে জড়িত না।
  • তাদের উপযোগী করে আপনার দাওয়াহ, বক্তব্য, লিফলেটের ভাষা, এবং উপস্থাপনা তৈরি করুন।
  • পর্যায়ক্রমে তাদের সক্রিয় এবং সংগঠিত করার দিকে মনোযোগী হন।

কৌশলগত ফোকাস:

  • এমন ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিন যা আপনার টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, যা তাদেরকে নাড়া দেবে। যেমন – 
    • অর্থনৈতিক সমস্যা (বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ফাইন্যানশিয়াল ম্যানেজমেন্ট, ক্যারিয়ার)
    • সামাজিক অবক্ষয় (অশ্লীলতা, হারাম সম্পর্ক, বৃদ্ধাশ্রম, পরিবারের ভাঙন)
    • জাতীয় চ্যালেঞ্জ (পানি সন্ত্রাস, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা, সীমান্ত হত্যা, গণহত্যার বিচার ইত্যাদি)

পর্যায়ক্রমিক সম্পৃক্তকরণ

  • প্রথমে সচেতনতা বৃদ্ধি/শিক্ষামূলক ক্যাম্পেইন এবং কিছু ছোটখাটো ডাইরেক্ট সার্ভিস কর্মকান্ড দিয়ে শুরু করুন।
  • ধাপে ধাপে অ্যাডভোকেসি এবং ডাইরেক্ট অ্যাকশনের দিকে যান।
  • গতিশীল থাকুন।
  • এমনভাবে কর্মসূচি ঠিক করুন যাতে ছোট এবং পরিমাপযোগ্য অর্জন দেখানো যায়। এতে করে অ্যাক্টিভিস্টদের মনোবল চাঙ্গা থাকে।
  • শিক্ষামূলক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আর বৃহত্তর কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি করুন।

প্রশ্ন: আপনাদের অ্যাক্টিভিজম ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে এবং ধাপে ধাপে কাঠামগত পরিবর্তন আনার সক্ষমতা অর্জন করছে – এটি কিভাবে নিশ্চিত করবেন?

অ্যাক্টিভিজম ক্যাম্পেইন পরিকল্পনার জন্য চেকলিস্ট

  • সমস্যা চিহ্নিত করুন: কোন প্রাতিষ্ঠানিক অথবা কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে আপনি কাজ করতে চান?
  • লক্ষ্য নির্ধারণ করুন: আপনি কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চান?
  • পদ্ধতি বাছাই করুন: এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অ্যাক্টিভিজমের কোন কোন পদ্ধতি সবচেয়ে উপযুক্ত?
  • মানুষকে সংগঠিত করুন: অংশীজন কারা, কিভাবে তাদের কর্মসূচির সাথে যুক্ত করবেন? কীভাবে জনগণের শক্তিকে কাজে লাগাবেন?
  • কাজের প্রভাব মূল্যায়ন করুন: আপনাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে কি দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়েছে? না হলে কেন হয়নি? হলে কেন হয়েছে? কোন ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে? কোন ক্ষেত্রে উন্নয়নের সুযোগ আছে? কোন ক্ষেত্রে সংশোধন আবশ্যক?

উদাহরণ 

  • বন্যা
    • ডাইরেক্ট সার্ভিস/সেবামূলক: ত্রাণ বিতরণ।
    • শিক্ষামূলক/সচেতনতা তৈরি: বন্যা কেন্দ্রিক বিপর্যয়ের পেছনে মূল কারণকে তুলে ধরা (যেমন, পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যা, প্রতিবেশী দেশের পানি সন্ত্রাস ইত্যাদি)।
    • অ্যাডভোকেসি: প্রতিবেশী দেশের সাথে নদীর পানি সংক্রান্ত নীতিমালা পুনঃমূল্যায়নের জন্য সরকারকে লবিয়িং করা, সুপারিশ করা।
    • ডাইরেক্ট অ্যাকশন: টেকসই সমাধান বা সরকারের নীতি পরিবর্তনের দাবিতে গণপ্রতিবাদ, ঘেরাও বা অবস্থান কর্মসূচি। 
  • শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্ক্রিন আসক্তি
    • ডাইরেক্ট সার্ভিস/সরাসরি সেবা: স্ক্রিন টাইম কমানোর লক্ষ্যে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি আয়োজন
    • শিক্ষামূলক/সচেতনতা তৈরি: স্ক্রিন আসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ওয়ার্কশপ আয়োজন, লিফলেট বিতরণ, অভিভাবকদের জন্য স্ট্রিট দাওয়াহ।
    • অ্যাডভোকেসি/সুপারিশমূলক: স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ, আঞ্চলিক কিংবা জাতীয় প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করা।
    • ডাইরেক্ট অ্যাকশন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলার মাঠসহ অন্যান্য বিনোদনমূলক সুবিধার দাবিতে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে রাস্তায় নামিয়ে প্রতিবাধ, অবস্থান কর্মসূচি, অবরোধ ইত্যাদি।

উপসংহার:

অ্যাক্টিভিজমের উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে সাহায্য করা না। অ্যাক্টিভিজমের মূল উদ্দেশ্য মানুষের ক্ষমতায়ন। অ্যাক্টিভিজমের উদ্দেশ্য জনমানুষকে তাদের হক আদায় ও সুরক্ষা করার জন্য সক্ষম করে তোলা। অ্যাক্টিভিজমের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং সেগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে জানার মাধ্যমে অ্যাক্টিভিস্টরা দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসইভাবে সামাজিক শক্তি অর্জনের জন্য কাজ করতে পারবেন।

মনে রাখবেন: অ্যাক্টিভিজমের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো কওমের মধ্যে এমন একটি শক্তি গড়ে তোলা যা কওমের স্বার্থ রক্ষার জণ্য সম্মিলিতভাবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।

প্রশ্ন: আপনাদের পরবর্তী ক্যাম্পেইন কিভাবে সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জনমানুষের ক্ষমতায়নের দিকে আগাতে পারে?