২০০১/২০০২ সালের কথা। আমাদের এলাকায় বেশ প্রভাবশালী কয়েকজন যুবক ছিল। বাপের টাকা পয়সার কোনো কুল কিনারা নেই। আর ওদেরও দিন দুনিয়ার কোনো খবর নেই। সবসময় গাজা মদ মেয়ে নিয়ে পড়ে থাকে। তবে এলাকার মানুষের ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু করতে পারে না। যা করে ঘরের মধ্যেই করে। এদের একবার শখ জাগলো যাত্রা নিয়ে আসবে গ্রামে। যাত্রায় সাধারণত যা হয়- নর্তকীরা নাচগান করে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হলো না গ্রামের সাধারণ মানুষের বিরোধিতার কারণে । ওদের বাপ ছিল অনেক প্রভাবশালী, চেয়ারম্যান, মেম্বার, গ্রামের বাজারের মহাজন টাইপের, টাকা পয়সা জায়গা জমির কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু অন্যদিকে গ্রামের সাধারণ মানুষেরা ছিল বেশীরভাগই কৃষক বা দিন মজুর।
একদিকে অঢেল টাকা পয়সা, মেম্বার চেয়ারম্যান অন্যদিকে সাধারণ দরিদ্র গ্রামবাসী। কিন্তু জিতলো দরিদ্র গ্রামবাসীরাই। এটা কেন হলো? কারণ সাধারণ গ্রামবাসীদের যা ছিল তা অনেক টাকা পয়সা বা বাপ মামা চাচা থাকার পরেও লম্পট যুবকদের ছিলো না- সামাজিক শক্তি।
আর একটা কাহিনী বলি। ২০১৪ সালে। সেই একই গ্রাম। এলাকার ১৫/২০ জন বখাটে চরিত্রহীন যুবক, মধ্যবয়স্ক মানুষ মিলে খুব বাজে একটা কাজ শুরু করল। ধান কাটার মৌসুম শেষ। মাঠ ফাঁকা পড়ে আছে। ওরা এই ফাঁকা মাঠে সন্ধ্যার পর মদ জুয়ার আসর বসাত। এবং পতিতা নিয়ে এসে জেনা ব্যভিচার করত।
ঠিক একই সময়ে গ্রামের অন্যপাশে ৫/৬ জন উঠতি বয়সী বখাটে রাত ২/৩টা পর্যন্ত সাউন্ডবক্সে হিন্দী আর কলকাতার বাংলা সিনেমার নায়ক দেবের গান বাজাত। মদ খেত। নাচানাচি করত। এরা কেউই তেমন শিক্ষিত বা ধনী পরিবারের ছেলে ছিল না।
গ্রাম আর ২০০১/২০০২ সালের মতো নেই। শিক্ষিতের হার অনেক বেড়েছে। অনেকে সরকারি চাকরি করে। অনেকে ভালো বেসরকারি চাকরি করে। কোটি টাকার মালিক এমন বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীও গ্রামে আছে। কিন্তু তারপরেও সমগ্র গ্রামবাসী মিলে কেন তাদের এই অশ্লীল কাজগুলো বন্ধ করতে পারল না? অথচ ১০/১২ বছর আগে সাধারণ গ্রামবাসী মিলেই মেম্বার চেয়ারম্যানের ছেলেদের রুখে দিতে পেরেছিল? কারণ ঐ একটাই- গ্রামবাসীরা সামাজিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
সামাজিক শক্তি কি জিনিস আশা করি একটু হলেও ধারনা পাচ্ছেন।
গল্প বাদ দিয়ে এবার একটু বই এর ভাষায় বলি। সামাজিক শক্তি হল নিজের বা চারপাশের যে পরিস্থিতি, আপনার নিজের বা আমাদের নিজেদের চারপাশের যে পরিস্থিতি- এটাকে নিয়ন্ত্রণ করার এবং এটাকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডক্টর জিন শার্প [Gene Sharp] এর মতে – সামাজিক শক্তি হল এমন সব ধরণের প্রভাব ও চাপ প্রয়োগের সক্ষমতার সমষ্টি, যা (সমাজের) এক গোষ্ঠী অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর উপর প্রয়োগ করে।
বুঝতেই পারছেন সামাজিক শক্তি অর্থ হলো সমাজে প্রভাব থাকা, চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা এবং এরকম আরও যত ক্ষমতা আছে এই সবগুলোর সমষ্টি হল সামাজিক শক্তি।
সমাজের এক গোষ্ঠী এটি ব্যবহার করে অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর উপরে। কেন? চাপ প্রয়োগের জন্য বা নিজের প্রভাব খাটানোর জন্য। এটা দিয়ে সে কি করতে চায়? এই শক্তি প্রয়োগ করা হয় কেন? কয়েকটা উদ্দেশ্য আছে-
একটা হল- অন্য যে গোষ্ঠীগুলো আছে তাদের আচরণকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে[1]।আমাদের সমাজে যারা সেক্যুলার আছে, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। আপনি দ্বীন ইসলামের কি বিষয়ে কথা বলতে পারবেন, কতটুকু কথা বলতে পারবেন, পোষাকের ক্ষেত্রে, এমনকি শেখানোর ক্ষেত্রে, লেখার ক্ষেত্রে, বলার ক্ষেত্রে, পড়ার ক্ষেত্রে আপনি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নাই। এটা সামাজিক শক্তির একটা উদ্দেশ্যে ।
আরেকটা উদ্দেশ্য হলো এই শক্তি প্রয়োগ করা হয় সামষ্টিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ঐ গোষ্ঠীর নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে। অর্থাৎ যেই গোষ্ঠীর সামাজিক শক্তি আছে সে ঐ শক্তিটা প্রয়োগ করে তার নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে এবং সেটা প্রয়োগ করে সামষ্টিকভাবে (collectively) একা একা না। যেমন ধরুন এলাকার সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ভ্যালেন্টাইন ডে তো এলাকার কোনো পার্ক খোলা থাকবে না, কোনো হোটেলে জেনা ব্যভিচার করতে দেওয়া হবে না সেজন্য হোটেলে নজরদারি করা হবে। এরপর সবাই মিলে সেটা বাস্তবায়ন করল।
যা সামাজিক শক্তি নয়-
সামাজিক শক্তির মানে আমার অনেক টাকা-পয়সা আছে- এমন না। এমন হতে পারে যে আপনার অনেক টাকা-পয়সা আছে কিন্তু আপনার এই ক্ষমতাগুলো নেই, যেই ক্ষমতাগুলোর কথা এখানে বলা হয়েছে [2]। এমন হতে পারে আপনি সংখ্যায় অনেক বেশি, আপনি ৯০% , কিন্তু এই ক্ষমতা আপনার নেই। আপনি আরেকজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। অথবা আপনি নিজের কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। এটা আসলেই হয়। এমন হতেই পারে যে কেউ সমাজের মাত্র ৮%, কিন্তু সে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারছে এবং অন্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। তারা সংখ্যায় কম হবার পরেও যে ক্ষমতা রাখে , ৯০% এর তা নেই[3]।
সামাজিক শক্তি মানে এটা নয় যে আপনার অনেক ব্যাংক আছে, আপনার অনেক ইন্ডাস্ট্রি আছে। এগুলোর মাধ্যমে হয়ত সামাজিক শক্তি অর্জন হতে পারে, তবে তা নিশ্চিৎ নয়। টাকা পয়সা জায়গা জমি প্রতিষ্ঠান থাকা নয় বরং সামাজিক শক্তি মানে ঐ সক্ষমতাগুলো – অন্যের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারা এবং নিজের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারে। এটা বোঝা খুব জরুরী। কারণ অনেকের মাঝেই সামাজিক শক্তি নিয়ে ভুল ধারণা আছে। তারা মনে করে, আমাদের যদি অনেকগুলো স্কুল থাকে, অনেকগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকে, অনেকগুলো কর্পোরেশন থাকে, আমাদের যদি ৪০—৫০ জন কোটি কোটি টাকার মালিক থাকে তাহলে হয়তবা আমরা সামাজিকভাবে শক্তিশালী হয়ে যাব। কিন্তু সামাজিক শক্তি অর্জনের জন্য এগুলো আবশ্যক না। এগুলো ছাড়াও সামাজিক শক্তি অর্জিত হয়[4]। শুরুর উদাহরণগুলো আবার একটু পড়ুন। আপনার দেখতে হবে আপনি এই দুটি সক্ষমতা অর্জন করেছেন কিনা। আপনি নিজের এবং চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করতে পারতেছেন কিনা?
বাংলাদেশে যেসব এঞ্জিও আছে বা এই টাইপের যত প্রতিষ্ঠান আছে তাদের তো অনেক মানুষ নেই। বা তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান নেই। তারা বাইরে থেকে থেকে ফান্ড নিয়ে এসে কাজ করে। কিন্তু তাও তারা দেশের আইনকে প্রভাবিত করতে পারে, পাঠ্যপুস্তকে ট্র্যান্সজেন্ডার ঢুকিয়ে দিয়েছে। অথচ আমরা কিন্ত এমন করতে পারিনা, অথচ আমরা মুসলিমরা ৯০%, এনজিওদের চেয়ে সামগ্রিকভাবে আমাদের টাকা পয়সার পরিমাণ অনেক বেশী। এরকম আরো উদাহরণ দেওয়া যাবে। এই ভুল ধারণাগুলো থেকে অবশ্যই বের হতে হবে যে, সামাজিক শক্তি মানে হলো আমার হাতে অনেক টাকা আছে, আমি সংখ্যাগুরু।
–
মূল পয়েন্টগুলো:
1. সামাজিক শক্তির সংজ্ঞা:
- সমাজের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করার সক্ষমতা।
- এক গোষ্ঠীর প্রভাব ও চাপ অন্য গোষ্ঠীর ওপর প্রয়োগ।
- ক্ষমতার সমষ্টি যা আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়।
2.সামাজিক শক্তির উদাহরণ:
- ২০০১/২০০২ সালে গ্রামের দরিদ্র মানুষ লম্পট যুবকদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে।
- ২০১৪ সালে শিক্ষিত ও ধনী গ্রামবাসী অশ্লীল কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়।
3. সামাজিক শক্তির উদ্দেশ্য:
- অন্য গোষ্ঠীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ।
- নিজস্ব উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন, যেমন যৌথ সিদ্ধান্ত ও প্রয়োগ।
4.সামাজিক শক্তি কি নয়:
- টাকা-পয়সা বা সম্পদ থাকা মানেই সামাজিক শক্তি নয়।
- সংখ্যা বেশি থাকলেও যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার ক্ষমতা না থাকে, তবে তা সামাজিক শক্তি নয়।
5.ভুল ধারণা:
- সম্পদ, সংখ্যা, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার মালিকানা সামাজিক শক্তির জন্য অপরিহার্য নয়।
- সামাজিক শক্তি অর্থের উপর নয় বরং প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার উপর নির্ভরশীল।
6. উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা:
- এনজিওরা সংখ্যায় কম এবং বাহ্যিক তহবিলের উপর নির্ভরশীল হলেও তারা বাংলাদেশের শিক্ষা ও আইন প্রভাবিত করতে পারে।
- মুসলমানরা ৯০% হলেও তাদের সামাজিক শক্তি অনুপস্থিত।
সারাংশ (Summary):
সামাজিক শক্তি হলো সমাজের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করার ক্ষমতা, যা অর্থ, সংখ্যা বা সম্পদ দ্বারা নয় বরং প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা দ্বারা নির্ধারিত হয়। উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, দরিদ্র গ্রামবাসীর ঐক্য ছিল সামাজিক শক্তির উদাহরণ, কিন্তু সম্পদশালী ও শিক্ষিতরা এটি হারিয়েছে। ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করাই সামাজিক শক্তি গড়ার মূল চাবিকাঠি।
[1] আগের উদাহরণগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখুন। প্রথম উদাহরণে লম্পট যুবকেরা যেন যাত্রা করতে না পারে। এবং দ্বিতীয় উদাহরণে গ্রামবাসীদের বিরোধিতার মুখে গিয়েও অশ্লীলতা, মদ জুয়া নাচ গানের আসর চালিয়ে যাওয়া।
[2] প্রথম উদাহরণে মেম্বার চেয়ারম্যানের ছেলেদের অনেক টাকা পয়সা থাকার পরেও যাত্রা করতে পারেনাই, গরীব গ্রামবাসীদের কাছে পরাজিত হয়েছে।
[3] দ্বিতীয় উদাহরণে লম্পট জুয়ারি মাতাল যুবকেরা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন, কিন্তু তারা এরপরেও সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামবাসীকে পরাজিত করে।
[4] দ্বিতীয় উদাহরণে অপেক্ষাকৃত গরীব ও কম শিক্ষিত যুবক ও তরুণদের কাছে ধনী ও শিক্ষিত গ্রামবাসীরা পরাজিত হয়েছে।