অ্যাক্টিভিস্ট ম্যানুয়াল: বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা

ভূমিকা: বাহ্যিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

সফল অ্যাক্টিভিজমের জন্য কেবল অ্যাক্টিভিস্ট ইউনিট সংক্রান্ত ম্যানেজমেন্ট যথেষ্ট না। নিজ এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং তা টিকিয়ে রাখাও সফল অ্যাক্টিভিজমের জন্য অত্যন্ত জরুরী। যেখানে কাজ করছেন সেখানকার পরিবেশ ও বাস্তবতা অ্যাক্টিভিস্টদের বোঝা টেকসই কাজ এবং প্রভাবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা কী?

আপনি যে এলাকাতে কাজ করেন সেখানে আপনাদের ইউনিটের বাইরেও আরও অনেক স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন আছে। যেমন-বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গণ্যমান্য ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সর্বোপরি এলাকার বৃহত্তর কমিউনিটি। এই সব স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন এবং তাদেরকে প্রভাবিত করার যেসব কৌশল এবং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর সমষ্টিই হল বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে:

  • এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্ক তৈরি করা।
  • আপনাদের অ্যাক্টিভিস্ট ইউনিটের ব্যাপারে এলাকার মানুষের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব তৈরি করা
  • বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমীকরণকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে সঠিক পলিসি ও কৌশল নির্ধারণ।

বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা কেন প্রয়োজন?

যেভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা একটি অ্যাক্টিভিস্ট ইউনিটের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, ঠিক তেমনিভাবে বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা একটি ইউনিটকে বাহ্যিক চাপ এবং চ্যালেঞ্জ থেকে রক্ষা করে। যথাযথ বাহ্যিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অ্যাক্টিভিস্ট ইউনিট ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে:

  • পরিবার বা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিরোধিতার কারণে।
  • প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সন্দেহ বা অবিশ্বাসের কারণে।
  • আইনগত বা প্রশাসনিক বাধার কারণে।

এই ম্যানুয়ালের কাঠামো

বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা কিভাবে করতে হবে তা সহজে, ধাপে ধাপে বোঝানোর লক্ষ্যে এই ম্যানুয়ালটিকে ৬ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে:

  • পারিবারিক সম্পর্ক
  • কমিউনিটির সাথে সম্পর্ক
  • প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক
  • স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ
  • মিডিয়া এবং জনসংযোগ
  • আইনগত এবং প্রশাসনিক দিক

বাহ্যিক ব্যবস্থাপনার মূল উপাদানসমূহ

১. পারিবারিক সম্পর্ক

অ্যাক্টিভিজম শুরু হয় ঘর থেকেই। সমাজ পরিবর্তনের অ্যাক্টিভিজমে সফল হতে হলে পরিবারার আস্থা এবং সমর্থন অর্জন করা জরুরী। যদি তা একান্তই সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে পরিবার যেন বিরোধী হয়ে যা যায়, তা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

  • পারিবারিক সম্পর্ক মজবুত করুন:
    • পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়মিত সালামের আদান-প্রদান করুন।
    • ভালো আখলাক এবং আদব মেনে চলুন।
    • পিতামাতার সেবা করার চেষ্টা করুন এবং তাদের প্রতি যত্নশীল হন।
  • বিরোধিতার জবাবে শান্ত থাকুন:
    • পরিবারের সদস্যরা যদি অ্যাক্টিভিজমের ক্ষেত্রে বিরোধিতা করে তাহলে রাগান্বিত হবেন না।
    • তাদের জন্য দোয়া করুন
    • পরিবারে দায়িত্বশীল আচরণ করুন।
  • আস্থা তৈরি করুন:
    • পরিবারের বিভিন্ন কাজে দায়িত্ব নেয়া এবং নির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালন করুন। এতে করে আপনার প্রতি পরিবারের আস্থা তৈরি হবে
    • এতে করে ধীরে ধীরে আপনার অ্যাক্টিভিজমের প্রতি তাদের সমর্থন তৈরি হবার সম্ভাবনা গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

২. কমিউনিটির সাথে সম্পর্ক

কমিউনিটির সাথে মজবুত সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে অ্যাক্টিভিজমের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।

  • স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন: এলাকার প্রবীন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং মসজিদের ইমাম-খতিব,খাদেমদের সাথে শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক গড়ে তুলুন। তাদের সমর্থন আপনার ইউনিটকে বিভিন্ন ধরণের বিরোধিতার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
  • কমিউনিটির ভেতর নিজেদের গেঁথে নিন: কমিউনিটির সমস্যা এবং স্বার্থের সাথে জড়িত বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে নিয়মিত কিছু কর্মসুচী দিন। বিভিন্ন স্থানীয় কর্মসূচীর মাধ্যমে এলাকায় নিজেদের পরিচিত করে তুলুন। মানুষের মধ্যে নিজেদের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করুন। যারা আপনার আদর্শের সাথে একমত না, তারাও যেন আপনাদের চেনে। এবং আপনাদের কমিউনিটি সংক্রান্ত কর্মকান্ডের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক

অ্যাকটিভিস্টদের অবশ্যই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কার্যকরী সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান:
    • প্রিন্সিপাল এবং স্টাফদের সাথে যোগাযোগ করুন, তারা যেন আপনাদের সমাজসেবামূলক লক্ষ্য ও কর্মকান্ডের ব্যাপারে অবগত থাকে।
    • শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব আছে এমন শিক্ষক সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন
    • স্কুল বা কলেজে কাজের ক্ষেত্রে লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে পারে এবং স্টাফদের (দারোয়ান, পিয়ন, রেজিস্ট্রার ইত্যাদি) সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন।
  • মসজিদ:
    • মসজিদ কমিটি, ইমাম এবং খাদেমদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করুন।
    • মসজিদকে জনসংযোগের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করুন।

৪. স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ

অ্যাকটিভিজম বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করে, তাই বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না।  তবে অ্যাক্টিভিজমকে অবশ্যই প্রচলিত রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে।

  • কাজের অরাজনৈতিক প্রকৃতি স্পষ্ট করুন: সোশ্যাল অ্যাক্টিভিজমের অরাজনৈতিক প্রকৃতি স্পষ্ট করুন। বারবার বলুন, আপনাদের কাজ সামাজিক। এর লক্ষ্য কওমের সেবা, কল্যাণ এবং স্বার্থ রক্ষা। প্রচলিত রাজনীতিতে আপনাদের আগ্রহ নেই। এ থেকে দূরে থাকতে বদ্ধপরিকর।
  • প্রয়োজনীয় সম্পর্ক তৈরি করুন: কাজের স্বার্থে প্রয়োজন অনুসারে রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখুন। তাদের মধ্যে এমন লোকেদের খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করুন, যারা আদর্শিকভাবে সরাসরি বিরোধিতা করে না। উল্লেখ্য এমন কোন ব্যক্তির সাথে চলমান সম্পর্ক রাখা উচিৎ না যার অনৈতিকতার বিষয়টি সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত (যেমন: এমন চেয়ারম্যান যে মাদকব্যবসা করে, বা এমন কাউন্সিলর যে জুয়ার হাউস চালায়)
  • মূল্যবোধ বজায় রাখুন: সেক্যুলারিজম এবং গণতন্ত্রের মতো বিষয়ে বিনয়ের সাথে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে অবস্থান নিন। এই মৌলিক অবস্থানগুলো ত্যাগ করা যাবে না। অস্পষ্ট রাখা যাবে না।

৫. মিডিয়া এবং জনসংযোগ

স্থানীয় মিডিয়ার ইতিবাচক কাভারেজ আপনাদের কাজের ব্যাপ্তি অনেক দূর বাড়িয়ে দিতে পারে।  তবে বিষয়টি সতর্কতার সাথে হ্যান্ডেল করা জরুরী।

  • স্থানীয় সাংবাদিক এবং মিডিয়া আউটলেটের সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন।
  • ফেসবুক, ইউটিউব এবং ওয়াটস্যাপ গ্রুপের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আপনাদের কাজের প্রচারণা ব্র্যান্ডিং চালিয়ে যান।
  • স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলুন।

৬. আইনগত এবং প্রশাসনিক দিক

  • স্থানীয় প্রশাসনিক, যেমন পুলিশ এবং মিউনিসিপাল অফিসের সাথে কাজের জন্য আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করুন।
  • বিভিন্ন আয়োজন এবং ক্যাম্পেইনের সময় আইনী কোন জটিলতা যেন তৈরি না হয় তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখুন।
  • যেসব ক্ষেত্রে প্রশাসনকে আগে জানানো বা অনুমতি নেয়া আবশ্যক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি আবশ্যক না) সেসব ক্ষেত্রে জটিলতা এড়াতে আগাম ব্যবস্থা নিন।

বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কিছু কার্যক্রম

১। সুন্নাহ কেন্দ্রিক জনসংযোগ: সুন্নাহ পালনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করুন।

  • সালাম: নিজ এলাকায় সালামের প্রসার ঘটান। অপরিচিত ব্যক্তিদের নিয়মিত সালাম দিন।
  • সাদাকাহ: হাদিসে এসেছে হাসিও সাদাকাহ হতে পারে। উত্তম ব্যবহার, কল্যাণকামীতা, সদয় আচরণ এবং হাসি মুখের দ্বারা সমাজে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলুন।
  • হাদিয়া: কারও সাথে সম্পর্ক তৈরি ও মজবুত করার জন্য ছোট কিন্তু অর্থবহ হাদিয়া (উপহার) দেয়ার চল শুরু করুন।

২. ইসলামি উৎসবকেন্দ্রিক সম্পৃক্ততা

  • ঈদের সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাদিয়া বিতরণ করুন, খাওয়া দাওয়া করুন।
  • এলাকায় নিজেদের উদ্যোগে সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ছোট আয়োজন করুন।

৩. বর্জনীয়

  • তর্ক এড়িয়ে চলুন: সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে এমন অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক থেকে বিরত থাকুন।
  • নম্রতা বজায় রাখুন: মানুষের সাথে আচরণ এবং কথোপকথনে সুন্নাহর অনুসরণ করুন। অহংকারের বদলে ইকরামের (সেবা-ভিত্তিক) মানসিকতা রাখুন।

শক্তিশালী বাহ্যিক ব্যবস্থাপনার সুফল

  • জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: আপনার ইউনিট এলাকার মধ্যে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
  • জটিলতা হ্রাস: সঠিক বাহ্যিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন বিরোধিতা এবং আইনি চ্যালেঞ্জকে কমিয়ে আনা সম্ভব
  • সমর্থক নেটওয়ার্ক: প্রয়োজনের সময় এলাকার মিত্ররা আপনাদের পাশে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।

উপসংহার বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা অ্যাকটিভিস্ট ইউনিটের জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্ক গড়ে তোলা, কমিউনিটির ভেতরকার বিভিন্ন সম্পর্ক ও ক্ষমতার সমীকরণ বোঝা, এবং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলার মাধ্যমে  অ্যাকটিভিস্টরা একটি টেকসই প্রভাব তৈরি করতে পারবেন।